পুলিশের কুদরতি: কুদরত-ই এখন কুদ্দুস!

পুলিশের কুদরতি: কুদরত-ই এখন কুদ্দুস!

4
SHARE
নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর: গাজীপুরের শ্রীপুরে পুলিশের কাছে বিচার না পেয়ে নিজের ১০ বছরের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দিয়ে দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতির ওপর ঘৃণা ছড়িয়ে গেছেন এক দিনমজুর।
গত ১ মে গোসিঙ্গা ইউনিয়নের কর্ণপুর সিটপাড়া গ্রামের দিনমজুর হযরত আলী তার পালিত মেয়ে আয়েশাকে নিয়ে ফরেস্ট অফিসের পাশেই চলন্ত ট্রেন তিস্তা এক্সপ্রেসের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। বিচার না পেয়ে বাবা মেয়ের এমন করুণ মৃত্যু দেশে ও জাতির বিবেককে নাড়া দিয়ে যায়। এমন খবর শুনেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও নিহত হযরত আলীর স্ত্রী হালিমার পাশে দাঁড়ান। প্রশ্ন ওঠে দরিদ্র মানুষের বিচার পাওয়ার অধিকার নিয়ে।
এ ঘটনার এক দিন পর নিহত হযরত আলীর স্ত্রী হালিমা বেগম বাদী হয়ে ৭ জনকে আসামি করে জিআরপি থানায় মামলা করে। এমন স্পর্শকাতর মামলার ঘটনায় ২৩ দিন পার হলেও প্রধান আসামিসহ কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
স্থানীয়রা জানান, অনেক দিন হয়ে গেলেও মামলার প্রধান আসামি ফারুকসহ কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। ১৭ মে রাতে এ মামলার তিন নম্বর আসামি কুদ্দুসকে (৪০) গ্রেফতার করে এসআই শহিদুল হক মোল্লা। প্রকৃতপক্ষে আটক ব্যক্তির নাম কুদরত আলী (৬০)। পিতা মৃত হুসেন আলী বেপারী। তবে পুলিশ কুদরত আলীকে কুদ্দুস বানাতে মরিয়া হয়ে পড়েছে। এ মামলায় কুদরত আলী নামে কোনো আসামির অস্তিত্বই নেই। তবুও পুলিশ কুদরত আলীকে মামলার আসামি কুদ্দুস বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।
পুলিশের দাবি বাদীকে দিয়ে আসামি শনাক্ত করা হয়েছে। তবে বাদীর দাবি পুলিশ আসামি দেখাননি। একটি ছবি দেখিয়েছে। পুলিশের দাবি কুদ্দুস (কুদরত আলী) কর্ণপুর গ্রামের রুমি রিসোর্টে পালিয়ে ছিল। তবে পরিবারের দাবি, সন্ধ্যায় নিজ বাড়ি থেকে তাকে ওসির সঙ্গে দেখা করার কথা বলে নিয়ে আসে এসআই শহিদুল হক মোল্লা। পরে শুক্রবার গরু চুরির মামলায় কুদ্দুস নামে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করেন।
আটক কুদরত আলীর মেয়ে লিজা জানান, ওই দিন (বৃহস্পতিবার) আব্বা সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অজুর আগে টয়লেট থেকে বের হয়ে ওঠানে দাঁড়ান, এমন সময় সাদা পোশাকে বাড়ির ভেতরে হনহন করে তিনজন লোক ঢুকে পড়েন। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই আব্বাকে জাপটে ধরে হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দেন। আমি প্রকৃত আসামির নাম জানতে চাইলে এক পুলিশ ক্ষিপ্ত হয়ে বলে চুপ থাক, চাকরি বাঁচে না, নাম বলার সময় কই। এ সময় আমি পুলিশের পায়ে ধরে বলি আমার আব্বা নির্দোষ, আমার আব্বার নাম কুদরত আলী। এ সময় আব্বার গায়ে কোনো জামা ছিল না, একটি জামাও পরতে দেয়নি পুলিশ। খালি গায়েই থানায় নিয়ে গেছে তারা।
প্রতিবেশী আবদুল মোতালেব (৯৫) জানান, কুদরত আলীর বাবা খুবই সুনামী ব্যক্তি ছিলেন। তাদের অনেক সহায়-সম্পত্তিও ছিল এক সময়। এখন অন্যের বাড়ি কাজ করে অন্যের জমি বর্গাচাষ করে সংসার চালায়। কুদরত আলীও ভালো মানুষ।
আটক কুদরত আলীর ছোট বোন মাসুদা জানান, নিজের নাম এমনকি বাবার নামও মিল নেই আমার ভাইয়ের। তবুও পুলিশ জোর করে কুদ্দুস বলে আটক করেছে। পরে থানায় গেলে পুলিশের সোর্স কর্ণপুর গ্রামের বেলুর ছেলে হিরণ আমাদের কাছে পুলিশের কথায় মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে যেন আসামিকে পুলিশ মারধর না করে। আমরা গরিব মানুষ টাকা দিতে পারিনি। এ জন্য আমার ভাইকেও ছাড়েনি। এখন প্রতিদিন টাকা চাচ্ছে।
মামলার বাদী হালিমা বেগম জানান, বৃহস্পতিবার রাতে আমাকে একটি ছবি দেখিয়েছে পুলিশ। আমি অন্ধকারে ভালো দেখিনি, তবে মনে হয়েছে, ছবির মানুষটি কুদ্দুস। পরে সকালে লোকমুখে শুনেছি কুদ্দুস না কুদরত আলীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
শ্রীপুর থানার এসআই শহিদুল হক মোল্লা বলেন, বাদী ছবি দেখে আসামি নিশ্চিত করেছে। পরে শুক্রবার গরু চুরি মামলায় তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।

NO COMMENTS